মাথার টিউমার হলে ডাক্তার কিভাবে পরীক্ষা করে?

মাথার টিউমার হলে ডাক্তার কিভাবে পরীক্ষা করে?

মানবদেহের সব কাজের মূল নিয়ন্ত্রক হলো মস্তিষ্ক। তাই মস্তিষ্কে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা টিউমারের সন্দেহ হলে চিকিৎসকরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রোগ নির্ণয়ের (Diagnosis) দিকে অগ্রসর হন। সময়মতো ও সঠিক পদ্ধতিতে ব্রেন টিউমার চিহ্নিত করা গেলে সফল চিকিৎসার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্রেন টিউমার পরীক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা ধারাবাহিক ধাপ অনুসরণ করা হয়। প্রাথমিক লক্ষণ দেখা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত বায়োপসি পর্যন্ত ডাক্তার কীভাবে মাথার টিউমার পরীক্ষা করেন, তার পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো।

১. প্রাথমিক নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষা (Neurological Examination)

যখন কোনো রোগী দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা, বমি ভাব, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা বা খিঁচুনির মতো লক্ষণ নিয়ে ডাক্তারের কাছে যান, তখন প্রথমেই একজন নিউরোলজিস্ট বা নিউরোসার্জন রোগীর শারীরিক ও স্নায়বিক পরীক্ষা করেন। এই পরীক্ষায় কোনো প্রকার যন্ত্র ব্যবহার না করেই মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা যাচাই করা যায়।

নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষায় যা যা দেখা হয়:

  • দৃষ্টিশক্তি ও অপটিক নার্ভ পরীক্ষা: চোখের রেটিনা পরীক্ষা করার জন্য ‘অফথালমোস্কোপ’ (Ophthalmoscope) যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। মস্তিষ্কের ভেতরের চাপ (Intracranial Pressure) বাড়লে অপটিক নার্ভ ফুলে যায়, যাকে ‘প্যাপিলডিমা’ (Papilledema) বলা হয়।
  • শ্রবণশক্তি ও ভারসাম্য (Balance & Coordination): রোগীর হাঁটার ধরণ, হাত-পায়ের সমন্বয় এবং কানের শোনার ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। সেরেবেলাম (Cerebellum) অংশে টিউমার থাকলে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
  • রিফ্লেক্স ও পেশির শক্তি (Reflexes & Muscle Strength): হাত ও পায়ের পেশির শক্তি ঠিক আছে কি না এবং হাঁটু বা কনুইতে আলতো চাপ দিয়ে নার্ভের রিফ্লেক্স পরীক্ষা করা হয়।
  • স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সচেতনতা: সহজ কিছু প্রশ্ন করে রোগীর স্মৃতিশক্তি, বিভ্রান্তি বা মনোযোগের মাত্রা পরিমাপ করা হয়।

২. ইমেজিং বা রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা (Imaging Tests)

নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষায় অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়লে ডাক্তার মস্তিষ্কের ভেতরের স্পষ্ট ছবি দেখার জন্য ইমেজিং টেস্টের পরামর্শ দেন। মাথার টিউমার ডায়াগনোসিসের প্রধান হাতিয়ার হলো এই পরীক্ষাগুলো।

ক. এমআরআই স্ক্যান (Magnetic Resonance Imaging – MRI)

ব্রেন টিউমার শনাক্ত করার জন্য MRI হলো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ পরীক্ষা। এতে কোনো ক্ষতিকর বিকিরণ বা রেডিয়েশন থাকে না; শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ও রেডিও ওয়েভ ব্যবহার করে মস্তিষ্কের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ছবি তোলা হয়।

  • কনট্রাস্ট এমআরআই (Contrast MRI): পরীক্ষার আগে রোগীর শিরায় বিশেষ এক ধরনের ডায় (Gadolinium) ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হয়। এটি রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে গিয়ে টিউমার টিস্যুকে আলাদাভাবে উজ্জ্বল করে তোলে, ফলে টিউমারের আকার ও সীমানা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
  • ফাংশনাল এমআরআই (fMRI): কথা বলা, হাত-পা নাড়ানো বা চিন্তা করার সময় মস্তিষ্কের কোন অংশ সক্রিয় থাকে তা এই স্ক্যানে দেখা যায়। সার্জারির আগে টিউমারের অবস্থান সুস্থ অংশের কতটা কাছে তা বোঝার জন্য fMRI অত্যন্ত কার্যকর।
  • এমআরআই স্পেকট্রোস্কোপি (MRS): এটি টিউমারের কেমিক্যাল বা রাসায়নিক গঠন মেপে বলে দেয় টিউমারটি বেনাইন (অ-ক্যান্সারাস) নাকি ম্যালিগন্যান্ট (ক্যান্সারাস)।

খ. সিটি স্ক্যান (Computed Tomography – CT Scan)

জরুরি অবস্থায় অথবা রোগীর শরীরে পেসমেকার/ধাতব কোনো বস্তু থাকলে (যার কারণে এমআরআই করা সম্ভব নয়) সিটি স্ক্যান করা হয়।

  • এটি বিশেষ এক্স-রে প্রযুক্তির মাধ্যমে মস্তিষ্কের সেকশনাল ছবি তৈরি করে।
  • মস্তিষ্কের হাড়ের ক্ষতি হয়েছে কি না বা টিউমারের ভেতর ক্যালসিয়াম জমেছে কি না তা সিটি স্ক্যানে ভালো বোঝা যায়।

গ. পেট স্ক্যান (PET Scan)

পজিত্রন এমিশন টমোগ্রাফি বা PET Scan মূলত ব্যবহৃত হয় টিউমারটি দ্রুত বাড়ছে কি না এবং শরীরের অন্য কোনো অংশ (যেমন: ফুসফুস বা স্তন) থেকে ক্যান্সারের কোষ মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়েছে কি না (Secondary/Metastatic Tumor) তা পরীক্ষা করতে।

৩. বায়োপসি ও টিস্যু পরীক্ষা (Biopsy & Tissue Analysis)

ইমেজিং টেস্টে টিউমারের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেলেও, এটি কোন ধরনের টিউমার এবং কতটা মারাত্মক (Grade) তা ১০০% নিশ্চিত হওয়া যায় একমাত্র বায়োপসি বা টিস্যু পরীক্ষার মাধ্যমে।

[সন্দেহজনক লক্ষণ] ➔ [নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষা] ➔ [MRI / CT Scan] ➔ [বায়োপসি ও গ্রেডিং]

বায়োপসির পদ্ধতিসমূহ:

১. স্টেরিওট্যাকটিক বায়োপসি (Stereotactic Biopsy): টিউমারটি যদি মস্তিষ্কের খুব গভীরে বা স্পর্শকাতর স্থানে থাকে যেখানে সার্জারি করা ঝুঁকিপূর্ণ, তখন কম্পিউটারের সহায়তায় থ্রি-ডি (3D) ম্যাপ তৈরি করে মাথার খুলিতে ছোট ছিদ্র করে সুইয়ের সাহায্যে টিউমারের টিস্যু সংগ্রহ করা হয়।

২. ওপেন বায়োপসি (Open Biopsy / Craniotomy): সার্জন যখন টিউমারটি কেটে ফেলার জন্য অপারেশন (Craniotomy) করেন, তখন কেটে ফেলা অংশ ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়।

ল্যাবে প্যাথলজিস্ট অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে কোষগুলো পরীক্ষা করে টিউমারের টাইপ ও গ্রেড নির্ধারণ করেন।

৪. অন্যান্য বিশেষায়িত পরীক্ষা

প্রয়োজনভেদে ডাক্তার আরও কিছু অতিরিক্ত পরীক্ষা করাতে পারেন:

  • লুম্বার পাঙ্কচার বা স্পাইনাল ট্যাপ (Lumbar Puncture): একটি বিশেষ সুই দিয়ে মেরুদণ্ডের নিচ থেকে সেফালোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF) সংগ্রহ করা হয়। টিউমারের কোষ মস্তিষ্কের তরলে ছড়িয়ে পড়েছে কি না তা জানার জন্য এই পরীক্ষা করা হয়।
  • ডিজিটাল সাবট্রাকশন অ্যানজিওগ্রাম (DSA): টিউমারের চারপাশে রক্তের নার্ভ বা রক্তনালীর বিন্যাস কেমন তা দেখার জন্য এই রক্তনালীর এক্স-রে পরীক্ষা করা হয়।
  • রক্ত ও হরমোন পরীক্ষা: পিটুইটারি গ্ল্যান্ডের (Pituitary Gland) টিউমার সন্দেহ হলে রক্তে হরমোনের মাত্রা (যেমন: প্রোলাক্টিন, থাইরয়েড, কর্টিসল) পরীক্ষা করা হয়।

ব্রেন টিউমার ডায়াগনোসিস পরীক্ষার তুলনা

পরীক্ষার নামসময়কালসুবিধাঅসুবিধা/সীমাবদ্ধতা
নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষা১৫-২০ মিনিটকোনো ব্যাথা বা খরচ নেই, প্রাথমিক ধারণার জন্য সেরা।টিউমার আছে কি না তা চূড়ান্তভাবে বলতে পারে না।
MRI Scan৩০-৪৫ মিনিটঅত্যন্ত স্পষ্ট ছবি দেয়, নরম টিস্যু চমৎকার দেখা যায়।খরচ বেশি, শব্দ হয় এবং মেটাল পেসমেকার থাকলে করা যায় না।
CT Scan৫-১০ মিনিটখুব দ্রুত হয়, জরুরি সময়ে সেরা।সফট টিস্যুর বিস্তারিত ছবি এমআরআই-এর মতো স্পষ্ট নয়।
Biopsyঅবস্থানভেদে ভিন্নটিউমারের ধরন ও ক্যান্সারের নিশ্চিত প্রমাণ দেয়।এটি একটি ইনভেসিভ (অস্ত্রোপচারভিত্তিক) প্রক্রিয়া।

সম্পর্কিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. মাথার কোন কোন লক্ষণ দেখলে টিউমারের পরীক্ষা করানো উচিত?

উত্তর: দীর্ঘদিন ধরে সকালে উঠে তীব্র মাথাব্যথা, অকারণ বমি ভাব বা বমি, হঠাৎ খিঁচুনি (Seizures), চোখে ঝাপসা বা দুটি দেখা, শরীরের একপাশ অবশ হওয়া এবং কথাবার্তা বা ব্যবহারে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত।

২. ব্রেন টিউমার পরীক্ষার জন্য প্রথমে কোন ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত?

উত্তর: প্রথমে একজন নিউরোলজিস্ট (Neurologist) বা নিউরোসার্জন (Neurosurgeon)-এর কাছে যাওয়া উচিত। তাঁরা লক্ষণ দেখে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা লিখে দেবেন।

৩. সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় কি ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে?

উত্তর: না, সাধারণ সিবিসি বা রক্তের অন্যান্য পরীক্ষায় ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে না। তবে পিটুইটারি টিউমারের ক্ষেত্রে হরমোন লেভেল দেখতে রক্ত পরীক্ষা করা হয়।

৪. এমআরআই (MRI) স্ক্যান করার সময় কি কোনো ব্যথা পাওয়া যায়?

উত্তর: একেবারেই না। এমআরআই একটি সম্পূর্ণ ব্যথাহীন পরীক্ষা। তবে পরীক্ষা চলাকালীন মেশিনের ভেতর শুয়ে থাকতে হয় এবং কিছুটা যান্ত্রিক শব্দ হয়, যার জন্য কানে হেডফোন দেওয়া থাকে।

৫. সিটি স্ক্যান নাকি এমআরআই—মস্তিষ্কের টিউমারের জন্য কোনটি ভালো?

উত্তর: মস্তিষ্কের টিস্যু ও টিউমারের সঠিক অবস্থান বোঝার জন্য এমআরআই (MRI) অনেক বেশি কার্যকর ও নির্ভুল। তবে প্রাথমিক পরীক্ষা বা হাড়ের অবস্থা দেখতে সিটি স্ক্যান ব্যবহার করা হয়।

৬. বায়োপসি করা কি বিপজ্জনক?

উত্তর: আধুনিক নিউরোসার্জারিতে স্টেরিওট্যাকটিক পদ্ধতি এবং নেভিগেশন গাইডেড প্রযুক্তির কারণে বায়োপসি অত্যন্ত নিরাপদ। তবে মস্তিষ্কের পরীক্ষা হওয়ায় এতে সামান্য কিছু ঝুঁকি থাকে, যা অভিজ্ঞ সার্জনরা দক্ষতার সাথে সামলে নেন।

৭. ব্রেন টিউমার পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে কতদিন সময় লাগে?

উত্তর: সিটি স্ক্যান বা এমআরআই রিপোর্টিং সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাওয়া যায়। তবে বায়োপসি বা হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্টের জন্য ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

৮. বাচ্চাদের মাথার টিউমার পরীক্ষা কি বড়দের মতোই?

উত্তর: হ্যাঁ, পদ্ধতিগুলো একই। তবে ছোট শিশুরা এমআরআই বা সিটি স্ক্যানের সময় স্থির হয়ে শুয়ে থাকতে পারে না বলে তাদের ক্ষেত্রে হালকা সিডেশন বা অবশ করার ওষুধ ব্যবহার করতে হতে পারে।

৯. ব্রেন টিউমার পরীক্ষা করাতে আনুমানিক খরচ কেমন হতে পারে?

উত্তর: পরীক্ষা ও হাসপাতালের ওপর নির্ভর করে খরচ ভিন্ন হয়। সাধারণ নিউরোলজিক্যাল ফি ছাড়াও এমআরআই স্ক্যানে বাংলাদেশে সাধারণত ৬,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা এবং বায়োপসিতে ১৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকার মতো খরচ হতে পারে।

১০. পরীক্ষা করার পরই কি অপারেশন করতে হয়?

উত্তর: না। টিউমারটি বেনাইন (অ-ক্ষতিকর), ছোট এবং লক্ষণহীন হলে ডাক্তার তা কেবল পর্যবেক্ষণে (Watchful Waiting) রাখতে পারেন। টিউমারের ধরন, আকার ও লক্ষণ দেখেই পরবর্তীতে সার্জারি, রেডিয়েশন বা কিমোথেরাপির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ব্রেন টিউমার সন্দেহ হওয়া মানেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা গেলে অধিকাংশ ব্রেন টিউমার সফলভাবে নিরাময় করা সম্ভব।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *